Dawatul Islam | জ্ঞান ও সম্পদের ভারবহন: দায়িত্ব ও বিকাশের দ্বন্দ্ব

বৃহস্পতিবার, ০২, এপ্রিল, ২০২৬ , ১৯ চৈত্র ১৪৩২

জ্ঞান ও সম্পদের ভারবহন: দায়িত্ব ও বিকাশের দ্বন্দ্ব
০৮ জানুয়ারী ২০২৬ ০৪:৫৩ মিনিট

কথিত আছে, “অশিক্ষিত ধনী হওয়ার চেয়ে শিক্ষিত গরীব হওয়া ভালো।” এই প্রবচনেই নিহিত জীবনের মর্ম: সম্পদের ভাণ্ডার যতই মোটা হোক, শিক্ষার আলো না থাকলে তা ভার ও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।  ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে ধন-জ্ঞান দুইয়ের ভারবহনের সামর্থ্য একেকজনের একেক রকম।  একজন অশিক্ষিত সম্পদশালী ব্যক্তির পক্ষে জ্ঞানের দায়িত্ব মান্য করা খুবই কঠিন; অপরদিকে, একজন শিক্ষিত ব্যক্তি সহজে উভয়—অর্থ ও বিদ্যার ভার—ভারবহন করতে সক্ষম হয়। এ প্রবন্ধে সেই পার্থক্যগুলো যাচাই করা হয়েছে, ব্যক্তিগত বিকাশ, দায়িত্ব ও সমাজে এর প্রভাব নিয়ে চিন্তা করা হয়েছে।

অশিক্ষিত ধনী: অজ্ঞতার ভারবহন

যে ব্যক্তির জীবনে প্রাপ্য জ্ঞান কম, তার জন্য সম্পদের ভার অনেক বেশি টেনে নেয়। সম্পদ থাকলেও আদর্শিকভাবে শিক্ষার ভিত্তি না থাকলে প্রতিদিনের সাধারণ জটিলতাও বোঝা হয়ে যায়।  অজ্ঞতার অন্ধকারে পড়া এক ধনী অনেকটা দিকনির্দেশহীন জাহাজের মতো, যার জন্য বিনিয়োগ, দান বা নেতৃত্ব সবই হাতছাড়া। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চবিত্ত মানুষরা অন্যের প্রয়োজনের প্রতি কম সহানুভূতি প্রকাশ করে এবং কখনো কখনো স্বার্থপর বা অনৈতিক পথ বেছে নিতে দ্বিধা করে না greatergood.berkeley.eduweforum.org অর্থাৎ, জ্ঞানের আলো ছাড়া সম্পদচক্রে সহজেই বিভ্রাট আসে।

অল্প জ্ঞান আর বিপুল সম্পদের মিলন থেকে অহংকার উত্থিত হয়; একদিকে উপভোগ, অন্যদিকে দায়িত্ববোধের অভাব। উদাহরণস্বরূপ, অনেক অশিক্ষিত কোটিপতি নিজের কঠোর পরিশ্রম অথবা নৈতিকতায় অমান্য হয়ে পড়ে।  বেকন (ফ্রান্সিস বেকন) বলেছেন, বোকা ব্যক্তি সম্পদ পেয়ে যে আনন্দ পায়, জ্ঞানী ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ লাভ করে” ebanglalibrary.com ফলে, শিক্ষার অভাবে পদ্মফুলের মত কোঁক্রো সম্পদ ভাগাড় হয়ে যায়, যা ব্যক্তির মনোবল ও চরিত্রে বিষক্রিয়া সঞ্চার করে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণাও নির্দেশ করে, তুলনামূলক নিম্নবিত্তদের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ পরিসরে অন্যের প্রয়োজন বোঝার প্রবণতা বেশি থাকে, অথচ বেশি সম্পদশালীদের মধ্যে ‘অধিকারবোধ’ বেড়ে যায় weforum.orggreatergood.berkeley.eduঅর্থাৎ, অশিক্ষিত ধনী প্রায়শই নিজের স্বার্থে অতিরিক্ত মনোযোগী হয়ে পড়ে, যা সমাজে অসাম্যের সৃষ্টি করে। এভাবে অশিক্ষার অভাবে ধন নিজেই অচল বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

শিক্ষিত ব্যক্তি: জ্ঞান ও সম্পদের দায়িত্ব

অন্যদিকে, শিক্ষার আলো পোষা একজন মানুষ ধন-জ্ঞান দুইয়ের ভার বহনে সচ্ছন্দ থাকে। শিক্ষিত ব্যক্তি নীতি, সম্মান ও বিচারের মানদণ্ড অর্জন করে; ফলে তার কাছে সম্পদ কেবল বাহ্যিক ক্ষমতা নয়, বরং এক দায়িত্ব ও উপহার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষ্যে, কম টাকা হলেও চলে যদি বুদ্ধি থাকে ও উদ্যম থাকে, যদি নিজের ওপর ভরসা থাকে” ebanglalibrary.comঅর্থাৎ, জ্ঞান আর উদ্যম থাকলে সামান্য সম্পদের মধ্যেও সন্তুষ্টি ও সাফল্য মেলে।

এমন একজনের জীবনে জ্ঞানের গুণাবলি থাকায় তার সম্পদ ব্যবহারে সতর্কতা ও সৎভাব থাকে। উইলিয়াম হুইটিয়ারের কথায়, বুদ্ধি থাকলে অর্থোপার্জন এবং অন্তর থাকলে তা খচর করা যায়” ebanglalibrary.comশিক্ষিত মানুষ অর্থ সৃষ্টি এবং সঞ্চয়ে কৌশলী; পাশাপাশি অন্তরের আলো (নৈতিকতা) থাকায় সম্পদের অপব্যবহার রোধ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এক শিক্ষিত উদ্যোক্তা তার আয়-ব্যয়ের হিসেব খোলামেলাভাবে সামলে প্রতিষ্ঠানে শুদ্ধাচার নিয়ে আসে। আর যদি জ্ঞানাশয় সমৃদ্ধ হলেও, সে মনে করে শেখার কোনো শেষ নেই; তাই জ্ঞানার্জন ও সম্পদের কর্মসূচিও সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করে।

সমাজেও শিক্ষিত ব্যক্তির ভূমিকা বড়: তিনি সমান অধিকারের দাবি জানায়, গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী হয় ebanglalibrary.comপ্রথম আলোর একটি লেখায় তুলে ধরা হয়েছে, জত বেশি শিক্ষা একজন ব্যক্তি অর্জন করেন, তত বেশি তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখার সুযোগ পান” অর্থাৎ শিক্ষিত ব্যক্তি শুধু নিজেকে নয়, সমাজকেও প্রগতি ও সমৃদ্ধিতে সহায়তা করে। মোটকথা, শিক্ষা যে ক্ষমতা সেটা স্পষ্টই বোঝায় যে শিক্ষিত ব্যক্তি দ্বৈত ভার (জ্ঞান ও সম্পদ) সত্ত্বেও দায়িত্ব পালন করতে পারে, যা অশিক্ষিতের ভারবহনের তুলনায় গুণিতকভাবে সহজ।

ব্যক্তিগত বিকাশ এবং দায়িত্বের পাল্লায়

শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিগত বিকাশে আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে আসে। এটি কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের না হয়েও অর্জিত হতে পারে, যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, সুশিক্ষা মানুষকে অভিভূত করে না, বরং মুক্তিদান করে”  মানসিক বিকাশ ঘটায়, কারণে-ফলশীল চিন্তা শেখায় এবং সংকট মোকাবেলায় সাহস দেয়। অন্যদিকে সম্পদ থাকা মানেই ব্যক্তির বিকাশ নয়; টাকা থাকলেও প্রজ্ঞা না থাকলে আত্মার বিকাশ অসম্পূর্ণ থাকে। যেমন গান্ধীজি বলেছেন, জ্ঞানই মানুষের গৌরব, শিক্ষাই মানুষের বিবেক, বিবেকই মানুষের মনুষ্যত্ব” ebanglalibrary.com

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জ্ঞান অর্জন মানুষকে নম্র করে, সংকট ও পরিবর্তনের সময় মনোবল বাড়ায়। স্বশিক্ষিত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে ওঠে ebanglalibrary.comএবং আত্মবিশ্বাস স্থায়ী হয়। আর বিপরীতে, শুধুমাত্র সম্পদ সঞ্চয়ে যে আত্মবিশ্বাস, তা প্রায়শই আস্ত মৃত্যু হয়; সহজেই ঈর্ষা, অশান্তি ও অহংকারের বীজ বইে দেয়। তাই বহুমুখী দৃষ্টিতে, জ্ঞানই আসল শক্তি ebanglalibrary.com; সম্পদ ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব, কিন্তু শিক্ষা ছাড়া জীবন লাঞ্ছিত হয়ে পড়ে।

সামাজিক প্রভাব ও দায়বদ্ধতা

সমাজের উন্নয়নে শিক্ষার অবদান অপরিসীম। শিক্ষিত নাগরিকরা ন্যায় ও নৈতিকতাকে মান্য করে, অন্যের অধিকারে শ্রদ্ধাশীল থাকে, ফলে সমাজে সমতা ও অগ্রগতি প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন প্রথম আলোতে লেখা আছে, শিক্ষাসম্পদের বৈষম্য হ্রাস করে, ব্যক্তিকে সমাজে অংশগ্রহণ ও অবদান রাখতে গড়ে তুলে” অর্থাৎ শিক্ষা সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনে এবং স্বাভাবিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে।

অপরদিকে, যদি সম্পদ থাকলেও শিক্ষার অভাব থেকে ব্যক্তির দায়িত্বশীলতা কম থাকে, তখন সমাজে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অশিক্ষিত ধনী ব্যক্তি কখনো কখনো স্বার্থে বিভক্ত হয়ে, সামাজিক ন্যায়ের পালা ফেলে দেয়। গবেষণায় উচ্চবিত্তদের অসদাচরণ এবং অধিকারবোধের কথা উঠে এসেছে greatergood.berkeley.eduweforum.orgএই ধরনের ব্যক্তিরা দরিদ্রদের প্রতি উদাসীন হয়ে সামাজিক সংঘাতে অবদান রাখে। ফলে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার গুরুত্ব বাড়ে: শিক্ষা না থাকলে গণতন্ত্র অচলও হয়ে পড়ে ebanglalibrary.com

সমাজের সর্বস্তরে দায়বদ্ধতা বহন করতে হলে জ্ঞানের বিকাশ জরুরি। ব্যক্তিবিশ্বে যেমন শিক্ষিত ব্যক্তি শুধু নিজের নয়, অন্যের কল্যাণেও মনোনিবেশ করতে পারে; ঠিক তেমনি রাষ্ট্র-সমাজও সে শিক্ষা স্পৃহার ওপরে প্রতিষ্ঠিত।শিক্ষা ছাড়া গণতন্ত্র অচল” ebanglalibrary.comএই কথায় প্রজ্ঞারই নির্দেশ: বিবেকমান মানুষ আনুগত্যবাদ নয়, দার্শনিক বিচার-বুদ্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

উপসংহার

সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, ধন-জ্ঞান উভয়ের ভারবহন ক্ষমতার ভিত্তিতে মানুষে মানুষে পার্থক্য গড়ে ওঠে। অশিক্ষিত ধনী যেদিক থেকে ধনী, সেই দিক থেকেই দুর্বল; কারণ জ্ঞানের হীনতায় তার দৃষ্টি সংকীর্ণ হয়ে যায়। অপরদিকে, শিক্ষিত ব্যক্তির জন্য জ্ঞান তার পাথেয় আর ধন তার যাত্রা-সঙ্গী। পরিশেষে বলা যায়, সম্পদ যদি গাছের ফল, তাহলে শিক্ষা সেই গাছের শিকড়। অপরিপক্ব শিকড় যে মাটিতে স্থিতি পায়না, সে গাছও ফল দিতে পারেনা। তাই ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে প্রকৃত সমৃদ্ধির জন্যে শিক্ষা অপরিহার্য, ধন নয়। জ্ঞানের আলো ছাড়া সম্পদ শুধুই ভারবহন; কিন্তু জ্ঞান থাকলে ধনসাৎ আত্মার প্রকৃত সাধনা হয়। যেমনটি অভিজ্ঞেরা বলেন, সাফল্য অর্জনের পথটা যতই কঠিন হোক না কেন, জ্ঞানের ওপর ভর করলেই যাত্রা মসৃণ হয়।

সব সংবাদ