আমাকে চায়ের দোকানে কেউ দেখে না

সুরা আলাক্ব: উচ্চারণ ও অনুবাদ
ٱقْرَأْ بِٱسْمِ رَبِّكَ ٱلَّذِى خَلَقَ
১) ইকরা বিছমি রাব্বিকাল্লাযী খালাক।
১) পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন
خَلَقَ ٱلْإِنسَٰنَ مِنْ عَلَقٍ
২) খালাকাল ইনছা-না মিন ‘আলাক।
২) সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।
ٱقْرَأْ وَرَبُّكَ ٱلْأَكْرَمُ
৩) ইকরা’ ওয়া রাব্বুকাল আকরাম
৩) পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু,
ٱلَّذِى عَلَّمَ بِٱلْقَلَمِ
৪) অল্লাযী ‘আল্লামা বিলকালাম।
৪) যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন,
عَلَّمَ ٱلْإِنسَٰنَ مَا لَمْ يَعْلَمْ
৫) ‘আল্লামাল ইনছা-না-মা-লাম ইয়া‘লাম।
৫) শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।
كَلَّآ إِنَّ ٱلْإِنسَٰنَ لَيَطْغَىٰٓ
৬) কাল্লাইন্নাল ইনছা-না লাইয়াতগা।
৬) সত্যি সত্যি মানুষ সীমালংঘন করে,
أَن رَّءَاهُ ٱسْتَغْنَىٰٓ
৭) আররাআ-হুছ তাগনা-।
৭) এ কারণে যে, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।
إِنَّ إِلَىٰ رَبِّكَ ٱلرُّجْعَىٰٓ
৮) ইন্না ইলা-রাব্বিকার রুজ‘আ-।
৮) নিশ্চয় আপনার পালনকর্তার দিকেই প্রত্যাবর্তন হবে।
أَرَءَيْتَ ٱلَّذِى يَنْهَىٰ
৯) আরাআইতাল্লাযী ইয়ানহা-
৯) আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে নিষেধ করে
عَبْدًا إِذَا صَلَّىٰٓ
১০) ‘আবদান ইযা-সাল্লা-।
১০) এক বান্দাকে যখন সে নামায পড়ে?
أَرَءَيْتَ إِن كَانَ عَلَى ٱلْهُدَىٰٓ
১১) আরাআইতা ইন কা-না ‘আলাল হুদা।
১১) আপনি কি দেখেছেন যদি সে সৎপথে থাকে।
أَوْ أَمَرَ بِٱلتَّقْوَىٰٓ
১২) আও আমারা বিত্তাকাওয়া-।
১২) অথবা খোদাভীতি শিক্ষা দেয়।
أَرَءَيْتَ إِن كَذَّبَ وَتَوَلَّىٰٓ
১৩) আরাআইতা ইন কাযযাবা ওয়া তাওয়াল্লা-।
১৩) আপনি কি দেখেছেন, যদি সে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়।
أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ ٱللَّهَ يَرَىٰ
১৪) আলাম ইয়া‘লাম বিআন্নাল্লা-হা ইয়ারা-।
১৪) সে কি জানে না যে, আল্লাহ দেখেন?
كَلَّا لَئِن لَّمْ يَنتَهِ لَنَسْفَعًۢا بِٱلنَّاصِيَةِ
১৫) কাল্লা-লাইল্লাম ইয়ানতাহি লানাছফা‘আম বিন্না-সিয়াহ।
১৫) কখনই নয়, যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি মস্তকের সামনের কেশগুচ্ছ ধরে হেঁচড়াবই-
نَاصِيَةٍ كَٰذِبَةٍ خَاطِئَةٍ
১৬) না-সিয়াতিন কা-যিবাতিন খা-তিআহ।
১৬) মিথ্যাচারী, পাপীর কেশগুচ্ছ।
فَلْيَدْعُ نَادِيَهُۥ
১৭) ফালইয়াদ‘উ নাদিয়াহ,
১৭) অতএব, সে তার সভাসদদেরকে আহবান করুক।
سَنَدْعُ ٱلزَّبَانِيَةَ
১৮) ছানাদ‘উঝঝাবা-নিয়াহ।
১৮) আমিও আহবান করব জাহান্নামের প্রহরীদেরকে
كَلَّا لَا تُطِعْهُ وَٱسْجُدْ وَٱقْتَرِب ۩
১৯) কাল্লা- লা-তুতি‘হু ওয়াছজু দ ওয়াকতারিব (ছিজদাহ-১৪)।
১৯) কখনই নয়, আপনি তার আনুগত্য করবেন না। আপনি সেজদা করুন ও আমার নৈকট্য অর্জন করুন।
বিষয়বস্তু:
সূরাটিতে চারটি বিষয় আলোচিত হয়েছে। এক- মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব ও সৃষ্টি কৌশল বর্ণনা (১-২ আয়াত)। দুই- পড়া ও লেখার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন কৌশল শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে মানুষের উপর আল্লাহ যে বিরাট অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন, তার বর্ণনা (৩-৫ আয়াত)। তিন- অগণিত নে‘মত পেয়েও মানুষ আল্লাহর অবাধ্যতা করে, যার পরিণতি হয় জাহান্নাম (৬-১৮ আয়াত)। চার- পাপীদের আনুগত্য না করে আল্লাহর প্রতি অনুগত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (১৯ আয়াত)।
শানে নুযুল:
নুযূলে অহি-র বিবরণ: নুযূলে অহি-র বছরে রবীউল আউয়াল মাস থেকে রাসূল (ছাঃ) সত্যস্বপ্ন দেখতে থাকেন। ছ’মাস পর রামাযান মাসে তিনি হেরা গুহাতে ই‘তিকাফ করেন। অতঃপর শেষ দশকে ক্বদর রাতে কুরআন নাযিলের সূচনা হয়। যা তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ২৩ বছরে শেষ হয়। এজন্য তাঁর সত্য স্বপ্নকে নবুঅতের ৪৬ ভাগের একভাগ বলা হয়’।
ইমাম আহমাদ হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন যে, প্রথম দিকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর ঘুমন্ত অবস্থায় সত্যস্বপ্নের মাধ্যমে ‘অহি’ নাযিলের সূচনা হয়। স্বপ্নে তিনি যা দেখতেন, প্রভাত সূর্যের মত তা সত্য হয়ে দেখা দিত। এরপর তাঁর মধ্যে নিঃসঙ্গপ্রিয়তা দেখা দেয়। তখন তিনি হেরা গুহায় গিয়ে রাত কাটাতে থাকেন। তিনি একত্রে কয়েকদিনের খাদ্য সাথে নিয়ে যেতেন। ফুরিয়ে গেলে খাদীজার কাছে ফিরে এসে আবার খাদ্য নিয়ে যেতেন। এইভাবে একরাতে তাঁর নিকটে হেরা গুহাতে সত্য এসে হাযির হ’ল। ফেরেশতা তাঁকে বলল, তুমি পড়। রাসূল (ছাঃ) বললেন,مَا أَنَا بِقَارِئٍ ‘আমি পড়তে জানি না’। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তখন ফেরেশতা আমাকে বুকে ধরে জোরে চাপ দিল। তাতে আমি হাঁপিয়ে উঠলাম। তখন বলল, ‘পড়’। বললাম, ‘পড়তে জানিনা’। এবার দ্বিতীয়বার চাপ দিয়ে বলল ‘পড়’। বললাম, পড়তে জানিনা। অতঃপর তৃতীয়বার চাপ দিয়ে বলল, اِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ ‘পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন’- এখান থেকে পরপর পাঁচটি আয়াত। রাসূল (ছাঃ) পাঠ করলেন। তারপর ফেরেশতা চলে গেল এবং রাসূল (ছাঃ) বাড়ীতে ফিরে এলেন। এ সময় ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি খাদীজাকে বললেন, زَمِّلُوْنِىْ زَمِّلُوْنِىْ ‘আমাকে চাদর মুড়ি দাও! আমাকে চাদর মুড়ি দাও’। অতঃপর চাদর মুড়ি দিয়ে কিছুক্ষণ থাকার পর তিনি বললেন, يَا خَدِيْجَةُ مَا لِىْ ‘খাদীজা আমার কি হ’ল’? তারপর তিনি সব খুলে বললেন এবং শেষে বললেন, قَدْ خَشِيْتُ عَلَىَّ ‘আমি মৃত্যুর আশংকা করছি’। তখন খাদীজা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, كَلاَّ أَبْشِرْ، فَوَاللهِ لاَ يُخْزِيْكَ اللهُ أَبَدًا، فَوَاللهِ إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَصْدُقُ الْحَدِيثَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُوْمَ، وَتَقْرِى الضَّيْفَ، وَتُعِيْنُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ ‘কখনোই না। সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনোই আপনাকে লজ্জিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, সত্য কথা বলেন, গরীবের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের কর্মসংস্থান করেন, অতিথি সেবা করেন এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন’। অতঃপর খাদীজা তাঁকে নিয়ে চাচাতো ভাই অরাক্বা বিন নওফেলের কাছে গেলেন। যিনি জাহেলী যুগে ‘নাছারা’ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আরবী লিখতে পারতেন এবং ইনজীল থেকে আরবী করতেন। তিনি অতি বার্ধক্যে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজা তাকে বললেন, ভাই দেখুন আপনার ভাতিজা কি বলছেন। অরাক্বা বললেন, বল ভাতিজা, কি দেখেছ? তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে সব খুলে বললেন, যা তিনি দেখেছেন। জওয়াবে অরাক্বা বললেন, هَذَا النَّامُوسُ الَّذِى أُنْزِلَ عَلَى مُوسَى، يَا لَيْتَنِى فِيهَا جَذَعًا، يَا لَيْتَنِىْ أَكُونُ حَيًّا، حِينَ يُخْرِجُكَ قَوْمُكَ– ‘এতো সেই ফেরেশতা যিনি মূসার উপর অবতীর্ণ হয়েছিলেন। হায়! যদি আমি সেদিন যুবক থাকতাম। হায়! যদি আমি সেদিন জীবিত থাকতাম। যেদিন তোমার সম্প্রদায় তোমাকে বহিষ্কার করবে’। একথা শুনে রাসূল (ছাঃ) বলে উঠলেন أَوَمُخْرِجِىَّ هُمْ ؟ ‘ওরা কি আমাকে বের করে দেবে?’ অরাক্বা বললেন, نَعم، لَمْ يَأْتِ رَجُلٌ قَطُّ بِمِثْلِ مَا جِئْتَ بِهِ إِلاَّ عُودِىَ ‘হ্যাঁ! তুমি যা নিয়ে আগমন করেছ, তা নিয়ে ইতিপূর্বে এমন কেউ আগমন করেননি, যার সাথে শত্রুতা করা হয়নি’। ছহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় إِلاَّ أُوذِىَ (যিনি নির্যাতিত হননি) এসেছে।[3] অতঃপর তিনি বললেন, إِنْ يُدْرِكْنِى يَوْمُكَ أَنْصُرْكَ نَصْرًا مُؤَزَّرًا ‘যদি তোমার সেই দিন আমি পাই, তবে আমি তোমাকে যথাযোগ্য সাহায্য করব’।
এর কিছু দিনের মধ্যেই অরাক্বা মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় ‘অহি’ নাযিল বন্ধ হয়ে যায়। যাতে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি বারবার পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকাতে থাকেন ফেরেশতাকে দেখার আশায়। হঠাৎ একদিন জিব্রীল তাঁর সামনে স্বরূপে প্রকাশিত হ’লেন এবং বললেন, يَا مُحَمَّدُ إِنَّكَ رَسُوْلُ اللهِ حَقََّا ‘হে মুহাম্মাদ অবশ্যই আপনি নিশ্চিতভাবে আল্লাহর রাসূল’। একথা শোনার পরে তাঁর অস্থিরতা দূর হয়ে গেল এবং হৃদয় ঠান্ডা হয়ে গেল। তিনি ফিরে এলেন এবং এরপর থেকে কিছু দিন অহি-র আগমন বন্ধ রইল।
একদিন তিনি রাস্তায় চলা অবস্থায় একটি আওয়ায শুনে উপরদিকে তাকিয়ে জিব্রীলকে আবির্ভূত হ’তে দেখেন, যেভাবে তিনি তাকে হেরা গুহায় দেখেছিলেন। এদিন তিনি তাকে আকাশ ও পৃথিবীব্যাপী চেয়ারের উপর বসা অবস্থায় দেখে ভীত হয়ে পড়েন এবং বাড়ীতে এসে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েন। তখন সূরা মুদ্দাছছির নাযিল হয়। এরপর থেকে অহী নাযিল চলতে থাকে (তাফসীর ইবনু কাছীর)।