Dawatul Islam | লজ্জাশীলতা, গোপনীয়তা ও অঙ্গিকার বিষয়ক কতিপয় হাদিস

সোমবার, ১৮, মে, ২০২৬ , ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

লজ্জাশীলতা, গোপনীয়তা ও অঙ্গিকার বিষয়ক কতিপয় হাদিস
০৫ অক্টোবর ২০২৩ ০৮:০০ মিনিট

লজ্জাশীলতা ও তার মাহাত্ম্যর প্রতিউৎসাহ প্রদান

ইবনে ’উমার রাদিয়াল্লাহু ’আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসার ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। যিনি তার ভাইকে লজ্জার ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ’’তাকে ছেড়ে দাও। কেননা, লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।’’ (বুখারী ও মুসলিম)

ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু ’আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’’লজ্জা মঙ্গলই বয়ে আনে।’’ (বুখারী ও মুসলিম)

মুসলিমের অন্য বর্ণনায় আছে, “লজ্জা মঙ্গলই সবটুকু” অথবা বলেছেন, ’’লজ্জার সবটুকু মঙ্গলই মঙ্গল”।

আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ’আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’’ঈমানের সত্তর অথবা ষাট অপেক্ষা কিছু বেশি শাখা রয়েছে। তার মধ্যে সর্বোত্তম শাখা ’লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা পথ থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেওয়া। আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।’’ (বুখারী ও মুসলিম)

গোপনীয়তা রক্ষার গুরুত্বারূপ

আবূ সা’ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ’আনহু বলেন, ’আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তঃপুরবাসিনী কুমারীর চেয়েও বেশি লজ্জাশীল ছিলেন। যখন তিনি কোন জিনিস অপছন্দ করতেন আমরা তাঁর চেহারায় তা বুঝতে পারতাম।’ (বুখারী ও মুসলিম)

আবূ সা’ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ’আনহু বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’’কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ সেই ব্যক্তি হবে, যে স্ত্রীর সঙ্গে মিলন করে এবং স্ত্রী তার সঙ্গে মিলন করে। অতঃপর সে তার (স্ত্রীর) গোপন কথা প্রকাশ করে দেয়।’’ (মুসলিম)

আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু ’আনহু হতে বর্ণিত। যখন উমার রাদিয়াল্লাহু ’আনহু-এর কন্যা হাফসা রাদিয়াল্লাহু ’আনহা বিধবা হয়ে গেলেন, তখন তিনি বললেন যে, আমি ’উসমান ইবনে ’আফ্ফানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং হাফসাকে বিবাহ করার জন্য দরখাস্ত দিয়ে তাঁকে বললাম, ’আপনি ইচ্ছা করলে আপনার বিবাহ আমি উমারের কন্যা হাফসার সাথে দিয়ে দিচ্ছি?’ তিনি বললেন, ’আমি আমার (এ) ব্যাপারে বিবেচনা করব।’ সুতরাং আমি কয়েকটি রাত্রি অপেক্ষা করলাম। অতঃপর তিনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, ’আমার এখন বিয়ে না করাটাই ভাল মনে করছি।’ (উমার বলেন,) অতঃপর আমি আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু ’আনহু-এর সাথে দেখা করে বললাম, ’যদি আপনি ইচ্ছা করেন, তাহলে আমি আপনার বিবাহ হাফসার সাথে দিয়ে দই।’ আবূ বকর চুপ থাকলেন এবং কোন উত্তর দিলেন না। সুতরাং আমি ’উসমান অপেক্ষা তাঁর প্রতি বেশী দুঃখিত হলাম।

তারপর কয়েকটি রাত্রি অপেক্ষা করলাম। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং তাকে বিবাহের পায়গাম দিলেন। ফলে আমি হাফসার বিবাহ তাঁর সাথেই দিয়ে দিলাম। তারপর আবূ বকর আমার সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন, ’আপনি আমাকে হাফসাকে বিবাহ করার দরখাস্ত দিয়েছিলেন এবং আমি কোন উত্তর দইনি। সেজন্য হয়তো আপনি আমার উপর দুঃখিত হয়েছেন? আমি বললাম, ’হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ’আমার আপনাকে উত্তর না দেওয়ার কারণ এই ছিল যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাকে বিবাহ করার ব্যাপারে আলোচনা করেছিলেন।  সুতরাং আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোপন কথা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলাম না।  যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাকে বর্জন করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই আমি তাকে গ্রহণ করতাম।’ (বুখারী)

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ’আনহা বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীরা সকলেই তাঁর কাছে ছিল। ইত্যবসরে ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু ’আনহা হেঁটে (আমাদের নিকট) এল। তার চলন এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চলনের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখে স্বাগত জানালেন এবং বললেন, ’আমার কন্যার শুভাগমন হোক।’ অতঃপর তিনি তাকে নিজের ডান অথবা বাম পাশে বসালেন। তারপর তিনি তাকে কানে কানে গোপনে কিছু বললেন। ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু ’আনহা জোরেশোরে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। সুতরাং তিনি তার অস্থিরতা দেখে পুনর্বার তাকে কানে কানে কিছু বললেন। ফলে (এবার) সে হাসতে লাগল। (আয়েশা বলেন,) অতঃপর আমি ফাতেমাকে বললাম, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের মাঝে (তাদেরকে বাদ দিয়ে) তোমাকে গোপনে কিছু বলার জন্য বেছে নেওয়া সত্ত্বেও তুমি কাঁদছ?’ তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন উঠে গেলেন, তখন আমি তাকে বললাম, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে কী বললেন?’ সে বলল, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোপন কথা প্রকাশ করব না।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুবরণ করলে আমি ফাতেমাকে বললাম, ’তোমার প্রতি আমার অধিকার রয়েছে। তাই আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলছি যে, তুমি আমাকে বল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে কী বলেছিলেন?’ সে বলল, ’এখন বলতে কোন অসুবিধা নেই।’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমবারে কানাকানি করার সময় আমাকে সংবাদ দিয়েছিলেন যে, ’’জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম প্রত্যেক বছর একবার (অথবা দু’বার) করে কুরআন শোনান। কিন্তু এখন তিনি দু’বার শুনালেন। সুতরাং আমি বুঝতে পারছি যে, আমার মৃত্যু সন্নিকটে। সুতরাং তুমি (হে ফাতেমা!) আল্লাহকে ভয় করো এবং ধৈর্য ধারণ করো। কেননা, আমি তোমার জন্য উত্তম অগ্রগামী।’’ সুতরাং আমি (এ কথা শুনে) কেঁদে ফেললাম, যা তুমি দেখলে। অতঃপর তিনি আমার অস্থিরতা দেখে দ্বিতীয়বার কানে কানে বললেন, ’’হে ফাতেমা! তুমি কি এটা পছন্দ কর না যে, মু’মিন নারীদের তুমি সর্দার হবে অথবা এই উম্মতের নারীদের সর্দার হবে?’’ সুতরাং (এমন সুসংবাদ শুনে) আমি হাসলাম, যা তুমি দেখলে।’ (বুখারী)

সাবেত হতে বর্ণিত, আনাস রাদিয়াল্লাহু ’আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন যখন আমি বালকদের সাথে খেলা করছিলাম। অতঃপর তিনি আমাদেরকে সালাম দিয়ে আমাকে কোন কাজে পাঠালেন। সুতরাং আমার মায়ের নিকট আসতে বিলম্ব হয়ে গেল। তারপর যখন আমি (বাড়ি) এলাম, তখন মা বললেন, ’কিসে তোমাকে আটকে রেখেছিল?’

আমি বললাম, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কোন প্রয়োজনে পাঠিয়েছিলেন।’ মা বললেন, ’তাঁর কী প্রয়োজন ছিল?’ আমি বললাম, ’সেটা তো ভেদের কথা।’ তিনি বললেন, ’তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভেদ খবরদার (কাউকে) বলবে না।’ আনাস রাদিয়াল্লাহু ’আনহু বলেন, ’আল্লাহর কসম! যদি আমি (এ ভেদ) কাউকে বলতাম, তাহলে তোমাকে বলতাম হে সাবেত!’ (মুসলিম)

প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পালনের গুরুত্ব

আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ’আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’’মুনাফিকের চিহ্ন হল তিনটি (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) ওয়াদা করলে তা খেলাপ করে। এবং (৩) আমানত রাখা হলে তাতে খিয়ানত করে।’’ (বুখারী ও মুসলিম)

মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, ’’যদিও সে রোযা রাখে এবং নামায পড়ে ও ধারণা করে যে, সে মুসলিম।’’

আব্দুল্লাহ ইবনে ’আমর ইবনুল ’আস রাদিয়াল্লাহু ’আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’’যার মধ্যে চারটি স্বভাব পাওয়া যাবে, সে খাঁটি মুনাফেক হয়ে যাবে। আর যার মধ্যে এগুলোর একটি স্বভাব থাকবে, তার মধ্যে মুনাফেকীর একটি স্বভাব থেকে যাবে; যতক্ষণ না সে তা বর্জন করবে। (১) তাকে আমানত দেওয়া হলে সে খিয়ানত করবে। (২) কথা বললে মিথ্যা বলবে। (৩) ওয়াদা করলে খেলাপ করবে। এবং (৪) ঝগড়া করলে গালি-গালাজ করবে।’’ (বুখারী ও মুসলিম)

জাবের রাদিয়াল্লাহু ’আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ’’বাহরাইন থেকে মাল এলে তোমাকে এতটা, এতটা এবং এতটা দেব।’’ অতঃপর বাহরাইনের মাল আসার পূর্বেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেলেন। তারপর বাহরাইনের মাল এসে গেলে আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু ’আনহু ঘোষণা করলেন, ’যার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট প্রাপ্য কোন প্রতিশ্রুতি অথবা ঋণ আছে, সে আমার নিকট আসুক।’ (ঘোষণা শুনে) আমি (জাবের) তাঁকে বললাম যে, ’নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এতটা মাল দেওয়ার ওয়াদা করেছিলেন।’ অতঃপর তিনি আঁজলা ভরে আমাকে দিলেন। আমি তা গুণে পাঁচশ’ পেলাম। তারপর তিনি বললেন, ’এর দ্বিগুণ আরো নাও।’ (বুখারী ও মুসলিম)

পোস্ট ট্যাগ:

১০০ টি হাদিস, ছোট হাদিস,চল্লিশ হাদিস pdf,গুরুত্বপূর্ণ হাদিস,হাদিস ১ ১০,বিখ্যাত হাদিস সমূহ,হাদীস,সহীহ হাদীস সমূহ।

সব সংবাদ