আমাকে চায়ের দোকানে কেউ দেখে না

بسْمِاللهِالرَّحْمٰنِالرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহ তা’আলার নামে, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
لَآأُقْسِمُبِهَٰذَاٱلْبَلَد
(১) লাউকছিমুবিহা-যাল বালাদ।
(১) (কাফেররা বলছে পরকালের শাস্তি নেই) না, (আছে) আমি এই (মক্কা) নগরীর শপথ করছি
وَأَنتَحِلٌّۢبِهَٰذَاٱلْبَلَدِ
(২) ওয়া আনতা হিল্লুম বিহা-যাল বালাদ।
(২) আর আপনি এই নগরীর অধিবাসী/আর আপনি এই নগরীতে হালাল।
وَوَالِدٍوَمَاوَلَدَ
(৩) শপথ জন্মদাতার (আদমের) এবং যা সে জন্য দিয়েছে (সেই আদম সন্তানদের)
(৩) ওয়া ওয়া-লিদিওঁ ওয়ামা-ওয়ালাদ।
لَقَدْخَلَقْنَاٱلْإِنسَٰنَفِىكَبَدٍ
(৪) নিশ্চয়ই আমি মানুষকে কষ্ট ও ক্লেশের মধ্যে সৃষ্টি করেছি।
(৪) লাকাদ খালাকনাল ইনছা-না ফী কাবাদ।
أَيَحْسَبُأَنلَّنيَقْدِرَعَلَيْهِأَحَدٌ
(৫) সে কি মনে করে যে, তার ওপর কেউ কখনো ক্ষমতাবান হবে না?
(৫) ওয়া ইয়াহছাবুআল্লাইঁ ইয়াকদিরা ‘আলাইহি আহাদ।
يَقُولُأَهْلَكْتُمَالًالُّبَدًا
(৬) সে বলে আমি প্রচুর ধন-সম্পদ নিঃশেষ করেছি।
(৬) ইয়াকূ লুআহলাকতুমা-লাল লুবাদা-।
أَيَحْسَبُأَنلَّمْيَرَهُۥٓأَحَدٌ
(৭) আইয়াহছাবুআল্লাম
ইয়ারাহূআহাদ।
(৭) সে কি মনে করে যে;
তাকে কেউ দেখেনি?
أَلَمْنَجْعَللَّهُۥعَيْنَيْنِ
(৮) আলাম নাজ‘আল্লাহূ‘আইনাইন।
(৮) আমি কি তার জন্য দুটি চোখ সৃষ্টি করিনি?
وَلِسَانًاوَشَفَتَيْنِ
(৯) ওয়া লিছা-নাওঁ ওয়া শাফাতাইন।
(৯) এবং একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট?
وَهَدَيْنَٰهُٱلنَّجْدَيْنِ
(১০) ওয়া হাদাইনা-হুন্নাজদাঈন।
(১০) আমি তাকে (হক ও বাতিলের) দুটি পথ দেখিয়েছি।
فَلَاٱقْتَحَمَٱلْعَقَبَةَ
(১১) ফালাকতাহামাল ‘আকাবাহ।
(১১) অতঃপর সে কষ্ট করে দুর্গম গিরিপথে (নেক আমলসমূহে) ঢোকেনি।
وَمَآأَدْرَىٰكَمَاٱلْعَقَبَةُ
(১২) ওয়ামাআদরা-কা মাল ‘আকাবাহ।
(১২) আপনি কি জানেন দুর্গম গিরিপথে ঢোকা কী?
فَكُّرَقَبَةٍ
(১৩) ফাক্কুরাকাবাহ ।
(১৩) তা হচ্ছে দাসমুক্তি
أَوْإِطْعَٰمٌفِىيَوْمٍذِىمَسْغَبَةٍ
(১৪) আও ইত‘আ-মুন ফী ইয়াওমিন যী মাছগাবাহ ।
(১৪) অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে খাদ্য দান করা।
يَتِيمًاذَامَقْرَبَةٍ
(১৫) ইয়াতীমান যা-মাকরাবাহ।
(১৫) এতিম আত্মীয়কে
أَوْمِسْكِينًاذَامَتْرَبَةٍ
(১৬) আও মিছকীনান যা-মাতরাবাহ।
(১৬) অথবা ধূলি-ধূসরিত মিসকীনকে
ثُمَّكَانَمِنَٱلَّذِينَءَامَنُوا۟وَتَوَاصَوْا۟بِٱلصَّبْرِوَتَوَاصَوْا۟بِٱلْمَرْحَمَةِ
(১৭) ছু ম্মা কা-না মিনাল্লাযীনা আ-মানূওয়াতাওয়া-সাও বিসসাবরি ওয়াতাওয়া-সাও বিল মারহামাহ।
(১৭) তদপুরি তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া, যারা ঈমান আনে এবং পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্যধারণের ও উপদেশ দেয় দয়া করার।
أُو۟لَٰٓئِكَأَصْحَٰبُٱلْمَيْمَنَةِ
(১৮) উলাইকা আসহা-বুল মাইমানাহ।
(১৮) তারাই সৌভাগ্যবান।
وَٱلَّذِينَكَفَرُوا۟بِـَٔايَٰتِنَاهُمْأَصْحَٰبُٱلْمَشْـَٔمَةِ
(১৯) ওয়াল্লাযীনা কাফারূবিআ-য়া-তিনা-হুম আসহা-বুল মাশআমাহ।
(১৯) আর যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে তারাই হতভাগা।
عَلَيْهِمْنَارٌمُّؤْصَدَةٌۢ
(২০) ‘আলাইহিম না-রুম মু’সাদাহ।
(২০) তাদের ওপর থাকবে আবদ্ধ আগুন।
সূরা বালাদ এর শানে নুযুল
আবুল আশাদ্দ নামে বনী জাহমে এক ব্যক্তি ছিল। সে ছিল অনেক শক্তিশালী। তার পায়ের নিচে চামড়া রেখে বলত, যে আমাকে এর থেকে সরাতে পারবে, তাকে অমুক পুরস্কার দেওয়া হবে। অতঃপর দশজন লোক মিলে চামড়া টেনে টুকরা টুকরা করে ফেললেও তার পা আপন জায়গা থেকে সরাতে পারত না। সে রাসূল স.-এর চরম শত্রু ছিল। তার সম্বন্ধে এই সূরার ৫, ৬, ৭ নং আয়াত নাযিল হয়েছে। যে কাফের ও পাপিষ্ঠের মধ্যে আয়াত সমূহে বর্ণিত নিকৃষ্ট গুণগুলো থাকবে, সেও আবুল আশাদ্দের সাথে এই আয়াত সমূহে শামিল হবে।
সুরারবিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য
বড় বিষয়বস্তুকে এই সূরায় কয়েকটি ছোট ছোট বাক্যে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটি পূর্ণ জীবন দর্শন ; যা বর্ণনার জন্য একটি বিরাট গ্রন্থের কলেবরও যথেষ্ঠ বিবেচিত হতো না তাকে এই ছোট্ট সূরাটিতে মাত্র কয়েকটি ছোট ছোট বাক্যে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী পদ্ধতিতে প্রকাশ করা হয়েছে। এটি কুরআনের অলৌকিক বর্ণনা ও প্রকাশ পদ্ধতির পূর্ণতার প্রমান। এর বিষয়বস্তু হচ্ছে , দুনিয়ায় মানুষের এবং মানুষের জন্য দুনিয়ার সঠিক অবস্থান , মর্যাদা ও ভুমিকা বুঝিয়ে দেয়া । মানুষকে একথা জানিয়ে দেয়া যে আল্লাহ মানুষের জন্য সৌভাগ্যের ও দুর্ভাগ্যের উভয় পথই খুলে রেখেছেন , সেগুলো দেখার ও সেগুলোর ওপর দিয়ে চলার যাবতীয় উপকরণও তাদেরকে সরবরাহ করেছেন। এবং মানুষ সৌভাগ্যের পথে চলে শুভ পরিণতি লাভ করবে অথবা দুর্ভাগ্যর পথে চলে অশুভ পরিণতির মুখোমুখি হবে , এটি তার নিজের প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে।
প্রথমে মক্কা শহরকে , এর মধ্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যেসব বিপদের সম্মুখীন হতে হয় সেগুলোকে এবং সমগ্র মানব জাতির অবস্থাকে এই সত্যটির সপক্ষে এই মর্মে সাক্ষী হিসেবে পেশ করা হয়েছে যে , এই দুনিয়াটা মানুষের জন্য কোন আরাম আয়েশের জায়গা নয়। এখানে ভোগ বিলাসে মত্ত হয়ে আনন্দ উল্লাস করার জন্য তাকে পয়দা করা হয়নি। বরং এখানে কষ্টের মধ্যে তার জন্ম হয়েছে ।
এরপর মানুষই যে এখানে সবকিছু এবং তার ওপর এমন কোন উচ্চতর ক্ষমতা নেই যে তার কাজের তত্বাবধান করবে এবং তার কাজের যথাযথ হিসেব নেবে , তার এই ভুল ধারণা দূর করে দেয়া হয়েছে।
তারপর মানুষের বহুতর জাহেলী নৈতিক চিন্তাধারার মধ্য থেকে একটি দৃষ্টান্ত স্বরূপ গ্রহণ করে দুনিয়ায় সে অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্বের যেসব ভুল মানদণ্ডের প্রচলন করে রেখেছে তা তুলে ধরা হয়েছে। যে ব্যক্তি নিজের বড়াই করার জন্য বিপুল পরিমাণ ধন – সম্পদ ব্যয় করে সে নিজেও নিজের এই বিপুল ব্যয় বহরের জন্য গর্ব করে এবং লোকেরা তাকে বাহবা দেয়। অথচ যে সর্বশক্তিমান সত্তা তার কাজের তত্বাবধান করছেন তিনি দেখতে চান , সে এই ধন সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে এবং কিভাবে , কি উদ্দেশ্যে এবং কোন মনোভাব সহকারে এসব ব্যয় করছে।
এরপর মহান আল্লাহ বলছেন , আমি মানুষকে জ্ঞানের বিভিন্ন উপকরণ এবং চিন্তা ও উপলদ্ধির যোগ্যতা দিয়ে তার সামনে ভালো ও মন্দ দু’টো পথই উন্মুক্ত করে দিয়েছি। একটি পথ মানুষকে নৈতিক অধপাতে নিয়ে যায়। এ পথে চলার জন্য কোন কষ্ট স্বীকার করতে হয় না। বরং তার প্রবৃত্তি সাধ মিটিয়ে দুনিয়ার সম্পদ উপভোগ করতে থাকে । দ্বিতীয় পথটি মানুষকে নৈতিক উন্নতির দিকে নিয়ে যায়। এটি একটি দুর্গম গিরিপথের মতো। এ পথে চলতে গেলে মানুষকে নিজের প্রবৃত্তি ওপর জোঁর খাটাতে হয়। কিন্তু নিজের দুর্বলতার কারণে মানুষ এই গিরিপথে ওঠার পরিবর্তে গভীর খাদের মধ্যে গড়িয়ে পড়াই বেশী পছন্দ করে।
তারপর যে গিরিপথ অতিক্রম করে মানুষ ওপরের দিকে যেতে পারে সেটি কি তা আল্লাহ বলেছেন। তা হচ্ছে : গর্ব ও অহংকার মূলক এবং লোক দেখানো ও প্রদর্শনী মূলক ব্যয়ের পথ পরিত্যাগ করে নিজের ধন – সম্পদ এতিম ও মিসকিনদের সাহায্যার্থে ব্যয় করতে হবে। আল্লাহর প্রতি ও তাঁর দীনের প্রতি ঈমান আনতে হবে আর ঈমানদারদের দলের অন্তরভুক্ত হয়ে এমন একটি সমাজ গঠনে অংশ গ্রহণ করতে হবে , যা ধৈর্য সহকারে সত্যপ্রীতির দাবী পূরণ এবং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি করুণা প্রদর্শন করবে। এই পথে যারা চলে তারা পরিণামে আল্লাহর রহমতের অধিকারী হয়। বিপরীত পক্ষে অন্যপথ অবলম্বনকারীরা জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। সেখান থেকে তাদের বের হবার সমস্ত পথই থাকবে বন্ধ।