যুদ্ধকালীন সময়ে মানসিক উদ্বেগের কুরআনিক চিকিৎসা

ভোটলড়াই শেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক মতবিনিময় সভায় কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি মুফতি আমির হামজা বলেন, “উপরওয়ালা কুষ্টিয়ায় কেউ নেই, উপরওয়ালা এখন আমি”। তিনি এই মন্তব্যের পূর্বে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলছিলেন, যখন কেউ বিষয়টিকে “আমাদের কন্ট্রোলের বাইরে” এবং “উপরওয়ালাদের দোষ” বলে মীমাংসার দায় এড়াতে চাইছিল। এ প্রসঙ্গে আমির হামজা জানান, তিনি বিষয়টিকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিচ্ছেন। যেমন যুগান্তর জানায়, কর্তৃপক্ষ বলেছিল বিষয়টি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, “উপরওয়ালাদের দোষ” – তখন তিনি জবাবে বলেছিলেন, “উপরওয়ালা কুষ্টিয়ায় কেউ নেই, উপরওয়ালা এখন আমি”। এনটিভি অনলাইনে একই কথাটি তুলে ধরা হয় কিছু বিস্তৃত বর্ণনাসহ: তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের দুর্নীতির অভিযোগে দালাল ও স্পিডমানিদের কথা উঠলে তিনি সরাসরি বলেছেন, “উপরওয়ালা কুষ্টিয়ায় কেউ নেই, উপরওয়ালা এখন আমি…দুই নম্বরি করতে চাইলে বলবেন ‘মাওলানার কাছে টাকা দেওয়া আছে’”। এ সব সংবাদ সূত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে যে ওই মুহূর্তে তিনি উপরের কোনো প্রতিষ্ঠাতাকেই (উদাহরণস্বরূপ আল্লাহকে নয়) বোঝানোর চেষ্টা করেননি, বরং স্থানীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি স্পষ্ট করেছিলেন।
মন্তব্যের উদ্দেশ্য ও প্রকৃত অর্থ
উক্ত কথার প্রসঙ্গে দেখা যায়, আমির হামজা মূলত স্থানীয় দুর্নীতি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়ে কথা বলছিলেন। যখন কেউ অভিযোগ করছিল, “এগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল, উপরের লোকজনের দায়” – তখন তিনি বলেন, “কুষ্টিয়ায় উপরওয়ালা বলে যে কেউ আসলে আর নেই, বর্তমানে উপরওয়ালার দায়িত্বটা আমার কাঁধে”। অর্থাৎ এখানে “উপরওয়ালা” শব্দটি দিয়ে বোঝানো হচ্ছে আদর্শগত বা মিথ্যাচারী লোক নয়, বরং প্রশাসনিক ক্ষমতাসীন কেউ বা দুর্নীতিবাজ চক্র; তিনি নিজেই সেই উচ্চকর্তৃপক্ষ হিসেবে এগিয়ে দাঁড়ানোর কথা জানাচ্ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, এনটিভি রিপোর্টে তিনি সরাসরি বলেন যে হাসপাতালের সব অভিযোগে দালাল এবং ঘুষখোরদের (স্পিডমানিদের) কথা এসেছে এবং “মাওলানার কাছে টাকা দেওয়া আছে” এরকম কথাও গোপনে কেউ জানায়[2]। সব মিলিয়ে তাঁর বক্তব্যটি ছিল জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে দায়িত্ব নিয়েছেন, আর এ কথা উচ্চারণের জন্য ‘উপরওয়ালা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অন্যান্য গণমাধ্যমেও একইরকম বর্ণনা পাওয়া যায় (যেমন যুগান্তর ও বিডি২৪-লাইভেও তিনি একই মন্তব্য করেছেন)।
উল্লেখযোগ্য, তিনি কোথাও বলেছেন “আমি আল্লাহ” বা “আমি ঈশ্বর” – এমন কোনও কথা নেই। বরং তার কথা থেকে বোঝা যায়, তিনি স্থানীয় প্রশাসনের এক দায়িত্বশীল নেতা হিসাবে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসছেন। অনলাইন ভিডিও ফুটেজেও দেখা যায় যে তিনি হাসপাতাল সমস্যা নিয়ে কথা বলার পরসংযোগে এই উক্তি করেছেন; সুতরাং এটি কোনো ধর্মীয় বক্তব্য নয়, বরং রাজনৈতিক-জনপ্রতিনিধিত্ব বিষয়ক বক্তব্য।
বিভ্রান্তিকর প্রচার ও শিরকের অভিযোগ
তবে কিছু মহল সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্তব্যটির মাত্রাকে গলিয়ে “উপরওয়ালা” শব্দটিকে ধর্মীয় অর্থে বোঝানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ তারা প্রচার করছে যেন মুফতি আমির হামজা নিজেকে ঈশ্বর ঘোষণা করেছেন। এধরণের প্রচার মোদ্দা কথা হচ্ছে বাক্যাংশটিকে আঁচড়ে ধরে বাক্যভঙ্গির ভিন্ন অর্থ দেওয়া। এ ক্ষেত্রে “উপরওয়ালা” শব্দটি আল্লাহর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় কিছু লোক তা গ্রাহ্য করে ফেলেছে, কিন্তু মিডিয়ার বিভিন্ন গণিতের মত এই মন্তব্যকে আকীদার (বিশ্বাসের) বিষয় বানানোর চেষ্টা করা হলো। প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনা যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে, তা একপ্রকার সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার ষড়যন্ত্র বলে মনে হয়।
অনেক সংবাদমাধ্যম এবং তথ্য যাচাই সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোটের সময় বিভিন্ন দলে এ ধরনের অপপ্রচার দেখা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্যাক্ট-ওয়াচ নিরীক্ষায় লক্ষ্য করা গেছে ফেসবুকে দৈনিক যুগান্তর, বিবিসি বাংলা ইত্যাদি গণমাধ্যমের নামে বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড ছড়িয়ে যাচ্ছে, যেগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া এবং কোন সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেনি। একইভাবে, প্রথম আলো ফ্যাক্টচেকেও দেখানো হয়েছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা ফটোকার্ড তৈরি করা হচ্ছে। এই সব রিপোর্টে বলা হয়, একটি সংগঠিত প্রচারণার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ফেসবুক একাউন্ট ভুয়া ফটোকার্ড ও তত্ত্ব প্রচারে লিপ্ত – যা সাধারণ পাঠককে বিভ্রান্ত করে। উপরের পরিস্থিতিতেও বলা চলে, একই কৌশল প্রয়োগ হয়েছে; মুফতি আমির হামজার কথাগুলোকে এই ফটোকার্ড বা স্ক্রিনশট হিসেবে ছড়িয়ে দিয়ে সেগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অন্য কথায়, বিভিন্ন কারিগরি মাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর এই চক্রের উদ্দেশ্য একজন জনপ্রতিনিধির ভাবমূর্তি নষ্ট করা। রাজনৈতিকভাবে তিনি জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, তাই বিরোধীদের উদ্দেশ্য হতে পারে জনমনে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে ভোটের ফলকে প্রভাবিত করা। অভিযোগ ধরণের শব্দভান্ডার (যেমন “শিরককারী”, “কুরআনশাস্ত্রবিরোধী”) ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ঈমান-আস্থা আঘাত করতে এই অপপ্রচারের লক্ষ্য। কৌশলগতভাবে তারা বিভ্রান্তিকর শিরোনাম, কার্টুন বা স্ক্রিনশট, এবং দ্রুত ভ্রাম্যমাণ ফেসবুক গ্রুপ/ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তথ্য ছড়িয়ে দেয়। এতে লোকালাভ করা হয় যে “নমনীয় কোনো সংবাদের লোগো সহ একটি পোস্টে আমির হামজা self-proclaimed বিষয়ের কথা বলেছেন” – যা সম্পূর্ণ গুজব।
প্রচারণার নির্দিষ্ট উপায় হিসেবে দেখা গেছে: - ভুয়া ফটোকার্ড: জনপ্রিয় সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের লোগো ব্যবহার করে ব্যক্তির নামে মিথ্যা উক্তি প্রদর্শন।
- সংলাপের অব্যবস্থিতি: তাঁর বলা বাক্যের কিছু অংশ নেওয়া ও বাক্য বিভক্ত করে ভিন্ন অর্থ দেখানো।
- ধর্মীয় কলঙ্ক: সাধারণ মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য ‘শিরক’ বা ‘অহংকার’ শব্দ ব্যবহার করে ধর্মের স্তরে বিতর্ক সৃষ্টি।
এই সব পদ্ধতির লক্ষ হল সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং আমির হামজা এমপি’র প্রতি আস্থা কমানো। ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জামায়াত-শিবির নেতাদের এই ধরণের অপপ্রচারের জন্য মূলত “একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষে বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড” ইন্টারনেটে ছড়ানো হয়। অর্থাৎ, নেতিবাচক প্রচারণার জাল বাঁধতে তারা সামাজিক মাধ্যমকে হাতিয়ার করেছে।
যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা ও ভুল ধারণার অবসান
আমির হামজার উক্তির প্রকৃত প্রসঙ্গ যেহেতু প্রশাসনিক, তাই ধর্মীয় কনটেক্সটে নিয়ে যাওয়া ভিত্তিহীন। এর পরিস্কার উদাহরণ তার নিজস্ব বক্তব্যে পাওয়া যায়: তিনি একদম পরোক্ষভাবে বলেছেন, “দালাল ও স্পিড মানি” সম্পর্কিত অভিযোগগুলো উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, যারা ঘুষ দিতে চায় তারা সরাসরি গিয়ে মাওলানার কাছে জানাক। এরকম কথোপকথনে কেবল মাটির মানুষেরই কথা হয়েছে; ঈশ্বরের সঙ্গত কোনো আঙ্গিক ছিল না। এছাড়া, যুগান্তর বা এনটিভির প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে তিনি পুরোপুরি একটি লোকাল সার্ভিস প্রসঙ্গেই কথা বলছেন। তাই ‘উপরওয়ালা’ শব্দটি আল্লাহকে নির্দেশ করে না বরং উপজেলা-জেলা-রাজ্যের উচ্চ পদস্থ কারও না থাকায় সেসব দায়িত্ব যেন তার কাছে এসে গেছে, সেই অর্থেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে তিনি নিজেকে বর্তমানে সবচেয়ে উপরের পদে দেখিয়েছেন।
ইসলামী শাস্ত্রে শিরক অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ, এবং একজন আলেম হিসেবে মুফতি আমির হামজা এ সম্পর্কে সতর্ক। তাই তাঁর বক্তব্যে নিজেকে “ঈশ্বর” বলা কোনোভাবে যুক্তিযুক্ত নয়। বরং তিনি নিজেকে দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন – যা মুসলমান জাতির আমলিয়াতের (দায়িত্বজ্ঞান) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অনেকে আক্ষেপ করে বলেছেন, “শিরকের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়”, কারণ বাস্তবে কথা বলার প্রসঙ্গটি ধর্মীয় নয়।
জনগণকে বিভ্রান্ত না করার জন্য যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা বেশ জরুরি। যেমন: - উপরওয়ালা শব্দের ব্যবহার: নিত্য কথোপকথনে এটি সাধারণত “উপরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তি” বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই প্রসঙ্গে আমির হামজা পরিষ্কার করছেন যে, আর কাউকে উপরের কেউ ধরে নেওয়া হচ্ছে না, তিনি নিজেই শীর্ষে আছেন।
- সম্প্রতি বক্তব্যের পরিসর: তিনি হাসপাতাল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে কাজ করছেন। তার বক্তব্য ছিল “আপনারা দোয়া করবেন, সুসংবাদ পেতে পারবেন” – এটা পরিষ্কারই দেখায় তার দৃষ্টি জনসেবায়।
- শিরক vs উদ্দীপনা: ইসলামে আল্লাহ ছাড়া কাউকে পূজার পদে তোলা নিষিদ্ধ। কিন্তু এখানে কথার ধরণ সম্পূর্ণ আখ্যানভিত্তিক; তিনি নিজেকে গম্ভীরভাবে ঈশ্বর বলেননি। যারা তাঁর কথাকে এভাবে বুঝেছেন, তারা হয়তো বিদ্রুপ বুঝতে পারেননি।
এ ছাড়া গণমাধ্যমেও যুক্তিতে পুনরায় ব্যাখ্যা প্রকাশ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জামানা টিভির এক আলোচনায় মন্তব্য করা হয়েছিল যে, “কথাটা আকীদার বিষয় করে তোলে ভুল”। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে মূল বক্তব্যকে শিরকের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিৎ নয়। ফলে সচেতন নাগরিকদের উচিত আসল বক্তব্য সম্পর্কে জেনে নেওয়া এবং গুজবের চক্রকে ভাঙ্গার চেষ্টা করা।
উপসংহার
উপরোক্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে মুফতি আমির হামজা এমপি’র কথার প্রকৃত তাৎপর্য ধর্মীয় নয়, বরং সরকারি দায়িত্বশীলতার একটি নিন্দনীয় ব্যাখ্যা ছিল। তার বক্তব্যের মাত্রা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা একটি পরিকল্পিত অপপ্রচারই বলা যায়। সাধারণ মানুষ যাতে বিভ্রান্ত না হয়, সেজন্য সঠিক প্রেক্ষাপট এবং যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা জানা জরুরি। মন্তব্য করার সময় রসিকতা বা উপমা ব্যবহৃত হলেও তা সরাসরি কুরআন বা হাদিসের ব্যাখ্যার অংশ নয়, এটি রাজনীতিক কথাবার্তা। তাই এভাবে আপোসহীন নেতাদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হওয়া বিপজ্জনক। শেষমেষ, অভিযোগের লক্ষ্য একটি জনপ্রতিনিধিকে কালিমালিপ্ত করা; সেজন্য প্রতিবাদের মূলমন্ত্র হল “আসল প্রসঙ্গ বুঝে নিন, ভুল ভয়াবহ গুজবের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করুন।”